//দেলোয়ার জাহিদ//
জীবনের দীর্ঘ পথচলায় মানুষ অনেক পরিচয়ে পরিচিত হয়—শিক্ষক, লেখক, সংগঠক, সম্পাদক, সমাজকর্মী কিংবা কর্মজীবনের যোদ্ধা হিসেবে। কিন্তু সময়ের শেষ প্রান্তে এসে উপলব্ধি করি, এই সব পরিচয়ের ঊর্ধ্বে যে পরিচয়টি সবচেয়ে গভীর, সবচেয়ে নীরব অথচ সবচেয়ে অর্থবহ, তা হলো—একজন পিতা হওয়া।
আশির দশক থেকে আমার জীবন নানা অভিজ্ঞতার বুননে গড়ে উঠেছে। বেসরকারি কলেজের শিক্ষকতা, সংবাদপত্র সম্পাদনা, সামাজিক সংগঠন পরিচালনা, স্বেচ্ছাসেবামূলক কর্মকাণ্ড—সব মিলিয়ে মানুষের জন্য কিছু করার এক নিরন্তর প্রয়াস ছিল আমার জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। কৈশোর ও যৌবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় কেটেছে কুমিল্লার একটি নিবন্ধিত সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠানের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে। শতাধিক শিশু, কিশোর ও যুবককে নিয়ে স্বেচ্ছাশ্রমে আমরা বহু সফল প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছি। তারও আগে, স্বাধীনতার মহান মুক্তিযুদ্ধের অগ্নিক্ষেত্র পেরিয়ে আমি বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে প্রবেশ করি। সেই জীবন আমাকে শিখিয়েছে সংগ্রাম, দায়িত্ব ও মানুষের প্রতি অঙ্গীকারের মূল্য।
কিন্তু আজ ফিরে তাকিয়ে দেখি, জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা আমি পেয়েছি আমার সন্তানদের বড় হতে দেখার মধ্য দিয়ে।
এক সময় ছিল যখন আমি আমার কন্যা ইশরাত জাহান মৌমিকে বিভিন্ন সম্মেলন, সামাজিক অনুষ্ঠান, কর্মশালা কিংবা শিক্ষামূলক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে উৎসাহিত করতাম। কিন্তু সে ছিল নিজের জগতে নিবিষ্ট, নিজের স্বপ্ন ও ভাবনার পথে চলতে আগ্রহী। অনেক সময় মনে হতো, আমি যে মূল্যবোধ, যে অভিজ্ঞতা কিংবা যে শিক্ষা তাকে দিতে চাই, সেগুলো আদৌ তার ভেতরে কোনো বীজ রোপণ করতে পারছে কি না।
আজ বুঝি, সন্তানকে শেখানো মানে তাকে নিজের প্রতিচ্ছবি বানানো নয়; বরং তাকে তার নিজস্ব সত্তাকে আবিষ্কারের সুযোগ করে দেওয়া। প্রকৃত শিক্ষা কখনো চাপিয়ে দেওয়া যায় না—তা সময়ের গভীরে নীরবে অঙ্কুরিত হয়।
২০২৬ সালের ৫ জুন, অটোয়ায় অনুষ্ঠিত CASWE-ACFTS জাতীয় সম্মেলনে যখন আমার কন্যা ইশরাত কানাডার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত গবেষক, শিক্ষাবিদ ও পেশাজীবীদের সামনে তার গবেষণাপত্র উপস্থাপন করছিল, তখন আমি একজন দর্শক ছিলাম না; আমি যেন সময়ের এক দীর্ঘ যাত্রাপথের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার অপেক্ষায় ছিলাম ।
তার গবেষণার বিষয় ছিল—‘কোভিড-১৯ চলাকালীন অন্তরঙ্গ সঙ্গীর সহিংসতার শিকারদের সহায়তা: সমাজকর্মে আন্তঃসংযুক্ত ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা’। বিষয়টির গভীরতা আমাকে মুগ্ধ করেছে, কিন্তু তার চেয়েও বেশি আমাকে স্পর্শ করেছে মানুষের প্রতি তার দায়বদ্ধতা, সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রতি তার অঙ্গীকার এবং মানবিক মর্যাদার পক্ষে তার অবস্থান।
সেই মুহূর্তে আমার মনে হলো, জীবনের প্রকৃত সার্থকতা ব্যক্তিগত অর্জনে নয়; বরং পরবর্তী প্রজন্মের হাতে মানবতার মশালটি তুলে দিতে পারার মধ্যে নিহিত।
আমরা পিতামাতারা প্রায়ই ভাবি, আমাদের সন্তানদের আমরা গড়ে তুলি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে উপলব্ধি করি, আমরা কেবল মাটিকে প্রস্তুত করি; বীজের ভেতরে যে সম্ভাবনা নিহিত থাকে, তার বিকাশের নিজস্ব নিয়ম আছে। একটি বৃক্ষ যেমন নিজের সময়ে ফুল ফোটায়, তেমনি একটি সন্তানও নিজের সময়ে তার অন্তর্নিহিত শক্তির প্রকাশ ঘটায়।
একজন পিতা হিসেবে আমি কৃতজ্ঞ—মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে, যিনি তাকে পথ দেখিয়েছেন; সেই সমাজের কাছে, যা তাকে বিকশিত হওয়ার সুযোগ দিয়েছে; এবং সেই সব মানুষদের কাছে, যারা তার জীবনের যাত্রায় সঙ্গী ও সহায়ক হয়েছেন। বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ তার জীবনসঙ্গীর প্রতি, যার নীরব সমর্থন, ধৈর্য ও উৎসাহ তার অগ্রযাত্রাকে শক্তিশালী করেছে।
আমার কাছে এই সাফল্য কেবল একটি গবেষণাপত্র উপস্থাপনার ঘটনা নয়। এটি সময়, শিক্ষা, মূল্যবোধ, অধ্যবসায় এবং মানবিক চেতনার এক দীর্ঘ অভিযাত্রার প্রতীক।
আজ আমি বিশ্বাস করি, সন্তানের সাফল্যে একজন পিতার আনন্দ কেবল গর্বের আনন্দ নয়; এটি এক ধরনের আত্মদর্শন। সেখানে তিনি নিজের অসমাপ্ত স্বপ্নের পূরণ খোঁজেন না, বরং প্রত্যক্ষ করেন নতুন এক মানুষের বিকাশ, যে নিজের আলোয় আলোকিত।
আমার প্রার্থনা একটাই—সে যেন জ্ঞান অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে প্রজ্ঞা অর্জন করে, সাফল্যের সঙ্গে নম্রতা ধারণ করে এবং মানুষের সেবাকে জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখে। তার কর্ম যেন ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে, এবং সে যেন কখনো ভুলে না যায় যে মানুষের প্রতি সহমর্মিতাই সকল জ্ঞানের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য।
অবশেষে, জীবনের এই দীর্ঘ পথচলায় এসে আমি উপলব্ধি করি—একজন অভিভাবকের সবচেয়ে বড় পুরস্কার সন্তানের কত দূর যাওয়া নয়; বরং তাকে সেই মানুষ হিসেবে বিকশিত হতে দেখা, যার জন্য তার জন্ম হয়েছে।
সন্তান যখন নিজের আলোয় উদ্ভাসিত হয়, তখন পিতার হৃদয়ে যে প্রশান্তি জন্ম নেয়, তার কোনো ভাষা নেই। সেটি গর্বেরও ঊর্ধ্বে—সেটি এক নীরব কৃতজ্ঞতা, জীবনের প্রতি, সময়ের প্রতি এবং সৃষ্টিকর্তার প্রতি।
Requirements not met
Your browser does not meet the minimum requirements of this website. Though you can continue browsing, some features may not be available to you.
Browser unsupported
Please note that our site has been optimized for a modern browser environment. You are using »an unsupported or outdated software«. We recommend that you perform a free upgrade to any of the following alternatives:
Using a browser that does not meet the minimum requirements for this site will likely cause portions of the site not to function properly.
Your browser either has JavaScript turned off or does not support JavaScript.
If you are unsure how to enable JavaScript in your browser, please visit wikiHow's »How to Turn on Javascript in Internet Browsers«.
আন্তর্জাতিক
কন্যার সাফল্য ও একজন পিতার আত্মদর্শন
- Details
- Additional Resources:
- Additional Resources:
- Agro-Ocean
- Bangabandhu Development and Research Institute
- Bangladesh North American Journalists Network
- Bangladesh Heritage and Ethnic Society of Alberta (BHESA)
- Coastal 19
- Delwar Jahid's Biography
- Diverse Edmonton
- Doinik Ekattorer Chetona
- Dr. Anwar Zahid
- Edmonton Oaths
- Mahinur Jahid Memorial Foundation (MJMF)
- Motherlanguage Day in Canada
- Samajkantha News
- Step to Humanity Bangladesh







