ছাপা 

 

প্রবাসে বাংলা নববর্ষ উদযাপন কেবল একটি উৎসব নয়; এটি বাঙালির সাংস্কৃতিক শেকড়ের সঙ্গে পুনঃসংযোগের এক শক্তিশালী মাধ্যম। কানাডা, আমেরিকাসহ বিশ্বের নানা দেশে এ উৎসবের বিস্তার প্রমাণ করে—নতুন প্রজন্মকে বাঙালি ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত রাখতে এর গুরুত্ব কতটা অপরিসীম। একইসঙ্গে, এ উদযাপন বাংলাদেশ-ভারতের সাংস্কৃতিক সম্পর্ককে দৃঢ় করে এবং উত্তর আমেরিকায় বাংলা সংস্কৃতির উপস্থিতিকে সমৃদ্ধ করে। তবে চৈত্র সংক্রান্তির মতো ধর্মীয় আচারকে সর্বজনীন বাঙালি সংস্কৃতি হিসেবে উপস্থাপন নিয়ে কিছু আলোচনা-সমালোচনাও রয়েছে। বাস্তবে সংস্কৃতি ধর্ম ও যাপিত জীবনের প্রতিফলন হলেও, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পহেলা বৈশাখই একমাত্র প্রকৃত সর্বজনীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উৎসব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। সাংস্কৃতিক আধিপত্যের প্রেক্ষাপটে নিজস্ব ঐতিহ্য রক্ষা আজও একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়।

পহেলা বৈশাখ—বাংলা নববর্ষ—একটি এমন উৎসব, যেখানে ধর্ম, বর্ণ, ভাষা, সংস্কৃতি, লিঙ্গ বা সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে সবাই অংশগ্রহণ করতে পারে। এর মূল লক্ষ্য পারস্পরিক সম্মান, বৈচিত্র্যের উদযাপন এবং সামাজিক সম্প্রীতি গড়ে তোলা। এ ধরনের উৎসবে সবার জন্য উন্মুক্ত অংশগ্রহণ, ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের মিলনমেলা, বৈচিত্র্যের স্বীকৃতি এবং সাম্য, সহনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধের প্রচার সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়।

বিশ্বের অন্যান্য বহুসাংস্কৃতিক সমাজেও এ ধরনের অন্তর্ভুক্তিমূলক উৎসবের দৃষ্টান্ত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে Independence Day (৪ জুলাই) জাতীয় দিবস হলেও তা এখন সর্বজনীন আনন্দোৎসবে রূপ নিয়েছে, যেখানে নানা সম্প্রদায়ের মানুষ একত্রে প্যারেড, আতশবাজি ও সামাজিক আয়োজনে অংশ নেয়। একইভাবে Thanksgiving কৃতজ্ঞতার দিন হিসেবে ধর্মীয় সীমানা ছাড়িয়ে পারিবারিক ও সামাজিক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। কানাডায় Canada Day বহুসাংস্কৃতিক ঐক্যের প্রতীক, আর Caribana টরন্টোর বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে উদযাপন করে। এছাড়া Toronto Pride Festival সমতা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার বার্তা বহন করে, এবং Winterlude শীতকালীন আনন্দ-উৎসবে বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে।

বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখ একটি সর্বজনীন, অসাম্প্রদায়িক উৎসব হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত। এর ঐতিহাসিক শিকড় Emperor Akbar-এর সময় প্রবর্তিত বঙ্গাব্দের সঙ্গে যুক্ত, যা মূলত কৃষি ও রাজস্ব ব্যবস্থার সুবিধার্থে চালু হয়। সময়ের সঙ্গে এটি বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। ঢাকার রমনা বটমূলে ছায়ানটের সংগীতানুষ্ঠান, মঙ্গল শোভাযাত্রা, বৈশাখী মেলা এবং পান্তা-ইলিশের মতো লোকজ আয়োজন এই দিনের বৈশিষ্ট্য। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার অংশগ্রহণ একে জাতীয় ঐক্যের উৎসবে রূপ দিয়েছে।

ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষত West Bengal ও ত্রিপুরায়, পহেলা বৈশাখ অত্যন্ত উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে উদযাপিত হয়। নতুন পোশাক পরা, ঘরবাড়ি পরিষ্কার করা, মন্দিরে প্রার্থনা, ‘হালখাতা’ খোলা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান—সব মিলিয়ে এটি এক আনন্দঘন সামাজিক উৎসবে পরিণত হয়, যেখানে সকল সম্প্রদায়ের মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়।

সম্প্রতি কানাডার আলবার্টায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের উদ্যোগে বর্ণাঢ্য আয়োজনে বাংলা নববর্ষ উদযাপিত হয়েছে, যেখানে শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়ার ম্যাকন শহরেও প্রবাসী বাংলাদেশি ও বিদেশিদের মিলনমেলায় এক টুকরো বাংলাদেশের আবহ ফুটে ওঠে—গ্রামীণ কৃষ্টি, ঐতিহ্যবাহী খাবার ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা সবার মন জয় করে।

তবে প্রবাসে বাংলা নববর্ষকে সত্যিকার অর্থে সর্বজনীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উৎসব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা একটি বড় প্রতিবন্ধকতা। এ সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন সচেতনতা বৃদ্ধি, সংলাপ এবং অংশগ্রহণমূলক উদ্যোগ। কমিউনিটি সংগঠনগুলোকে এমন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে হবে, যেখানে সবাই নিরাপদে ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিতে পারে। তরুণ প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করে শিক্ষা, আলোচনা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ জোরদার করা জরুরি। পাশাপাশি, স্থানীয় বহুসাংস্কৃতিক নীতিমালার সঙ্গে সমন্বয় এবং গণমাধ্যমে ইতিবাচক প্রচারণা ভ্রান্ত ধারণা দূর করতে সহায়ক হতে পারে। সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে প্রবাসে বাংলা নববর্ষকে একটি সত্যিকারের সর্বজনীন, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সম্প্রীতির উৎসবে রূপান্তর করা সম্ভব।

লেখক: দেলোয়ার জাহিদ, স্বাধীন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও মুক্তিযোদ্ধা, সভাপতি, বাংলাদেশ নর্থ আমেরিকান জার্নালিস্ট নেটওয়ার্ক, এডমন্টন, আলবার্টা, কানাডা