ছাপা 


//দেলোয়ার জাহিদ//

বাংলার ইতিহাস কেবল ভৌগোলিক সীমারেখার ইতিহাস নয়; এটি স্মৃতি, উদ্বাস্তুতা, ভাষা, সংস্কৃতি, সংগ্রাম ও রাজনৈতিক চেতনার এক দীর্ঘ যাত্রা। ১৯৭১ সালের বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ সেই ইতিহাসে এক গভীর বাঁক তৈরি করেছিল, যার প্রভাব পশ্চিমবঙ্গের সমাজ, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক জনতত্ত্বে আজও প্রবলভাবে দৃশ্যমান।

আমার নিজের জীবনও সেই ইতিহাসের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে। ছাত্রজীবনের শুরুতে পশ্চিমবঙ্গই ছিল প্রথম বিদেশের মাটি, যেখানে আমি কোনো পরিচয়পত্র ছাড়াই সীমান্ত পেরিয়ে গিয়েছিলাম আশ্রয় ও মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণের সন্ধানে। ঢাকা জেলায়  রায়পুরার নারায়ণপুর বাজার থেকে মেঘনা নদী পেরিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সংলগ্ন সীমান্তের পথে পৌঁছেছিলাম “নরশিংগড়” ক্যাম্পে। সেই অভিজ্ঞতা শুধু রাজনৈতিক চেতনা নয়, মানবিক ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গিকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। পরবর্তীতে ১৯৮৭ সালে সাংবাদিক হিসেবে  Jyoti Basu, Buddhadeb Bhattacharjee এবং Nripen Chakraborty-এর মতো নেতাদের সাথে সাক্ষাৎ আলোচনা থেকে যে রাজনৈতিক আদর্শ, সরলতা ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার শিক্ষা পেয়েছি, তা আজও আমার চিন্তাজগতে গভীরভাবে প্রোথিত।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় বিপুল উদ্বাস্তু প্রবাহ পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী অঞ্চলের জনসংখ্যা, নগরায়ন ও ভোটব্যাংকের কাঠামোকে বদলে দেয়। উদ্বাস্তু রাজনীতি, বিশেষ করে হিন্দু উদ্বাস্তু ও মতুয়া সম্প্রদায়ের উত্থান, পরবর্তী সময়ে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। অন্যদিকে মুসলিম জনসংখ্যার পরিবর্তন, সীমান্ত রাজনীতি এবং নাগরিকত্ব প্রশ্ন ধীরে ধীরে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসে।

১৯৭৭ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত বামফ্রন্ট পশ্চিমবঙ্গে শ্রেণিভিত্তিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির একটি অনন্য মডেল গড়ে তুলেছিল। ভূমি সংস্কার, কৃষক ও শ্রমিক রাজনীতি এবং ধর্মনিরপেক্ষতা ছিল সেই রাজনীতির মূল ভিত্তি। কিন্তু দীর্ঘ শাসনের ফলে প্রাতিষ্ঠানিক জড়তা তৈরি হয় এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি নতুন বাস্তবতা হিসেবে আবির্ভূত হয়।

২০১১ সালে Mamata Banerjee-এর নেতৃত্বে পশ্চিমবঙ্গে নতুন রাজনৈতিক যুগের সূচনা হয়। তৃণমূল কংগ্রেস সংখ্যালঘু ভোট, নারী ভোটার, গ্রামীণ দরিদ্র এবং বাংলা সাংস্কৃতিক পরিচয়কে কেন্দ্র করে শক্তিশালী জনভিত্তি গড়ে তোলে। “বাংলা নিজের মেয়েকেই চায়” ধরনের রাজনৈতিক ভাষ্য আঞ্চলিক সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদকে নতুন শক্তি দেয়। একই সঙ্গে কন্যাশ্রী, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার ও স্বাস্থ্যসাথীর মতো কল্যাণমূলক প্রকল্প নারী ও নিম্নআয়ের মানুষের মধ্যে গভীর রাজনৈতিক প্রভাব সৃষ্টি করে।

অন্যদিকে ২০১৪ সালের পর BJP পশ্চিমবঙ্গে দ্রুত উত্থান ঘটায়। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (CAA), সীমান্ত নিরাপত্তা, হিন্দু উদ্বাস্তু রাজনীতি ও জাতীয়তাবাদী আবেগকে সামনে এনে তারা পশ্চিমবঙ্গে নতুন ধরনের রাজনৈতিক মেরুকরণ তৈরি করে। ফলে পশ্চিমবঙ্গের পুরোনো বাম-কংগ্রেস-তৃণমূল সমীকরণ বদলে গিয়ে “তৃণমূল বনাম বিজেপি” কেন্দ্রিক দ্বিমুখী বাস্তবতা তৈরি হয়।

২০২৬ সালের রাজ্য নির্বাচন আবারও দেখিয়েছে যে ভারতের গণতন্ত্র মূলত বহুমাত্রিক আঞ্চলিক বাস্তবতার সমষ্টি। West Bengal ও Tamil Nadu বিশেষভাবে দুটি ভিন্ন রাজনৈতিক মডেল হিসেবে সামনে এসেছে। পশ্চিমবঙ্গ দেখিয়েছে সাংস্কৃতিক পরিচয়, কল্যাণনীতি ও আবেগভিত্তিক জনমুখী রাজনীতির শক্তি; অন্যদিকে Tamil Nadu উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার ও প্রশাসনিক দক্ষতার উপর ভিত্তি করে “ডেভেলপমেন্টাল ফেডারেলিজম”-এর সফল উদাহরণ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

আজকের পশ্চিমবঙ্গ আর কেবল শ্রেণিভিত্তিক বাম রাজনীতির রাজ্য নয়; এটি এখন পরিচয়, কল্যাণনীতি, ধর্মীয় মেরুকরণ, সীমান্ত রাজনীতি, নারী ভোটব্যাংক ও ডিজিটাল রাজনৈতিক প্রচারণার জটিল সমন্বয়ে গঠিত একটি রাজনৈতিক ভূখণ্ড। তবে গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি এখানেই—জনগণ শেষ পর্যন্ত নিজেরাই সিদ্ধান্ত নেয় এবং প্রয়োজন হলে সেই সিদ্ধান্ত সংশোধনও করে। ইতিহাস সাক্ষী, কোনো রাজনৈতিক শক্তিই চিরস্থায়ী নয়; কিন্তু মানুষের স্বাধীনতা, মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা চিরন্তন। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক যাত্রা সেই চিরন্তন গণতান্ত্রিক অভিযাত্রারই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বাংলাদেশ সহ পৃথিবীর গণতন্ত্রমনা দেশগুলো এ বহুমুখী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক চর্চা থেকে শিক্ষা নিতে পারে।